এম এ মোমিন আনসারী, গাজীপুর থেকে:
নিজের নাম সই দিতে পারেন না, এমএলএসএস (পিয়ন) হয়ে মাস গেলে বেতন গোনেন অর্ধলাখ টাকা। গাড়িচালকও কম না– মাইনে ৫৩ হাজার। অফিস সহকারী পান ৬৮ হাজার টাকা। ক্লিনারের বেতন ৪৫ হাজার টাকা। এ গেল ছোট গোছের কর্মচারী।
সর্বোচ্চ পদের নির্বাহী পরিচালক বেতন নেন চার লাখ, পরিচালকরা পাচ্ছেন প্রায় তিন লাখ আর সিনিয়র স্পেশালিস্টরা নেন আড়াই লাখ টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে এমনই উদার কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ)! প্রতিষ্ঠানটি চালাতে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার খরচা। বেতনের পেছনে টাকা ওড়ালেও যে জন্য এই ফাউন্ডেশন, সেই কাজে ঠনঠন।
কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নকাজে আর্থিক-কারিগরি সহায়তা দেওয়ার ঝান্ডা উড়িয়ে ২০০৭ সালে কেজিএফের আবির্ভাব। রাজধানীর ফার্মগেটের এই প্রতিষ্ঠান আদতে জয়েন্ট স্টক নিবন্ধিত কোম্পানি।
তবে যাত্রার পর থেকেই কেজিএফ হয়ে যায় অবসরে যাওয়া কৃষি কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে! কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে টাকা বরাদ্দ দেওয়া আর কয়েকটি প্রকাশনা বের করেই দায় শেষ। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকায় যে গবেষণা হয়, তা কতটা কার্যকর– সেটির তদারকিরও যেন সময় নেই। গেল ১৮ বছরে কৃষি খাতে প্রতিষ্ঠানটির তেমন অবদান না থাকলেও ঠিকই খোলা ছিল অনিয়মের দরজা। নিয়োগ দুর্নীতি, আত্মীয়করণ, দলীয়করণ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামীপন্থি একটি চক্র অনুদান লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফাউন্ডেশনের জনবল নীতিমালা অনুযায়ী, কিছু ছোট পদ ছাড়া প্রায় সব পদেই ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সিস্টেমভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিরা কেজিএফে চাকরির সুযোগ পান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা খরচা করেও কেজিএফ কৃষির উন্নয়নে তেমন কিছুই করতে পারেনি। কিছু ব্যক্তির লোভের কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রাণ হারাচ্ছে। এ জন্য দরকার জনবল ঢেলে সাজানো। যোগ্য নেতৃত্ব পেলে কেজিএফ কৃষিতে অভাবনীয় অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করেন গবেষকরা। তারা আশা করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খুঁড়িয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াবে; গবেষণায় আলো ছড়াবে।
প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর্যন্ত কেজিএফে অর্থায়ন করে বিশ্বব্যাংক। এর পর থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা এন্ডাওমেন্ট ট্রাস্টের (বিকেজিইটি) অর্থায়নে চলছে ফাউন্ডেশনটি। প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদন হওয়ার পর ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৩৪ প্রকল্পে। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ত জমিকে চাষের আওতায় আনা, জলবায়ুবিষয়ক গুটিকয়েক কার্যক্রম, গম চাষের উন্নয়ন ও খরাসহিষ্ণু জাত উন্নয়ন ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলোর ইতিবাচক তেমন ভূমিকা নেই।
২০২২ সালে কেজিএফের বোর্ড ও জেনারেল বডির চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. শেখ বখতিয়ার। তখন তিনি ‘১০০ কৃষি প্রযুক্তি অ্যাটলাস’ নামে একটি বই প্রকাশে কেজিএফ থেকে ৮৫ লাখ টাকা খরচ করেন।
এই টাকার অধিকাংশই তছরুপ হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। পরে আরও চারটি পুস্তিকা কেজিএফের টাকায় প্রকাশ করেন বখতিয়ার। প্রতিটিতে খরচ হয় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কেজিএফ থেকে নেন ১০ কোটি টাকা। বখতিয়ার তাঁর আপন ভাগনি সারজানা রহমানকে চুক্তিভিত্তিক অ্যাসিস্ট্যান্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে চাকরিও দেন।
এ বিষয়ে জানতে ড. শেখ বখতিয়ারকে ফোন করা হলেও তাঁর নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর দুর্নীতিতে অভিযুক্ত সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তা আত্মগোপনে আছেন।
এ ছাড়া কেজিএফের ওয়েবসাইট তৈরিতে খরচ হয় পাঁচ লাখ টাকা। ওয়েবসাইটটি নিয়মিত তদারকির পেছনেও খরচ হচ্ছে লাখ টাকা।
২০২১ সালের ১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাবিষয়ক মতবিনিময় সভার কার্যবিবরণী ওয়েবসাইটে পাওয়া গেছে। সে সভায়ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক কেজিএফের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, একসময় কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি পঙ্গু। নির্বাহী পরিচালক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার কারণে হযবরল অবস্থা। কর্মকর্তারা ব্যস্ত দলাদলি ও কাদা ছোড়াছুড়িতে।
কৃষিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা, প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণে অর্থ সহায়তা দেয় কেজিএফ। ফাউন্ডেশনটি পরিচালিত হয় ১৫ সদস্যের সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে। এর মধ্যে থেকে নির্বাচিত সাতজনকে নিয়ে গঠন হয় পরিচালনা পরিষদ। বিকেজিইটি ২০১২ সাল থেকে কেজিএফের অর্থের জোগান দিচ্ছে।
আর ওয়ায়েস কবীরের ভায়রা ও মাহমুদা বেগমের স্বামী মেহেদী হাসানকে ২০০৯ সালে বসানো হয় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। ২০১১ সালে জালিয়াতির মাধ্যমে মেহেদীকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করা হয়। পরে ২০১৫ সালে তাঁকে ম্যানেজার (অ্যাডমিন অ্যান্ড এসএস) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওয়ায়েস কবীর ভায়রাকে চাকরি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বেতনও ঠিক করেছেন ইচ্ছামতো। ২০১১ সাল থেকেই মেহেদীকে এক লাখ টাকা বেতন দেওয়া হতো। মেহেদী নন-টেকনিক্যাল হলেও টেকনিক্যাল সব কার্যক্রমে যুক্ত আছেন। সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের ভোল পাল্টে মেহেদী পুরো ফাউন্ডেশনে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের সুপারিশে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট হিসেবে ২০১৭ সালে নিয়োগ পান বেগম নাসরিন আক্তার। এখন তিনি সিনিয়র স্পেশালিস্ট (ডকুমেন্টেশন, পাবলিকেশন ও যোগাযোগ) হিসেবে কর্মরত। নাসরিন আক্তার নিউপোর্ট ইউনিভার্সিটি সিইডি, রিগায় পিএইচডির ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন বলে জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেন।
ড. মো. আককাছ আলী পরিচালক (শস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ) হিসেবে ২০২১ সালের নভেম্বরে নিয়োগ পান। তিনি জনবল নীতিমালা ২০২০-এর অধীনে নিয়োগ পেলেও নিয়ম অনুযায়ী তাঁর আবেদন করার যোগ্যতাই ছিল না। ২০২১ সালের নভেম্বরে পরিচালক (প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদ) হিসেবে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. রাজ্জাকের সুপারিশে বিনা প্রতিযোগিতায় নিয়োগ পান ড. নাথুরাম সরকার।
বর্তমানে তিনি নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত। ড. মো. নাজিরুল ইসলাম সিনিয়র স্পেশালিস্ট (উদ্যানতত্ত্ব) পদে ২০২২ সালের জুলাইয়ে ও ড. মো. খলিলুর রহমান ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সিনিয়র স্পেশালিস্ট (মৎস্যসম্পদ ও জলজসম্পদ) পদে নিয়োগ পান।
জন্মলগ্ন থেকেই নির্বাহী পরিচালক পদ নিয়ে ধুঁকছে কেজিএফ। এই চেয়ারে একবার বসলে ছাড়ার নাম নেন না কেউ। করেন ফন্দিফিকির। গেল ১৭ বছরে তিনজন নিয়মিত নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ পান। এর মধ্যে ড. নুরুল আলমের পর ২০১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ড. ওয়ায়েস কবীর দায়িত্বে ছিলেন।
এই তিন বছরেই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালের শেষ দিকে ড. জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস নির্বাহী পরিচালক হন। ২০২২ সালের জুনে তিনি অবসরে গেলেও দুই মাস পর আবার তাঁকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নির্বাহী পরিচালকের চেয়ারে বসানো হয়।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনে বখতিয়ারের সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও আওয়ামীপন্থি নাথুরামই আছেন বহাল। ড. নাথুরাম সরকারের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় লিফট কেনাকাটায় অনিয়মসহ নানা দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।
কেজিএফের নির্বাহী পরিচালক ড. নাথুরাম সরকার বলেন, জয়েন্ট স্টক আইন ও প্রক্রিয়া মেনে পরিচালিত হচ্ছে কেজিএফ। আমরা কৃষিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রস্তাবনা আহ্বান করি, সে অনুযায়ী টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকি।
অনেক গবেষণামূলক প্রকল্পে নানা জটিলতার কারণে সরকার অর্থ দেয় না। ফলে সরকারের বাইরে গবেষণা কাজে কেজিএফ সহায়তা করে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদের বিষয়ে বোর্ড সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা এন্ডাওমেন্ট ট্রাস্টের (বিকেজিইটি) চেয়ারম্যান ও কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, কেজিএফ যেন কৃষির অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আমরা বসব। ফাউন্ডেশনের পেছনে যে টাকা খরচ হচ্ছে এর কার্যকারিতা কতটুকু তাও খতিয়ে দেখা হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে গতিশীল করতে যা যা করা দরকার তা আমরা করব।