স্বনির্ভরতার আলোয় শখকে অর্থকরী করে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নরসিংদীর তরুণ উদ্যোক্তা তৌকিব হোসেন। ৪ বছর আগে মাত্র ৮টি গরু নিয়ে শুরু করা তার ছোট্ট খামার এখন পরিণত হয়েছে লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তার জে এস এগ্রো ফার্মে রয়েছে ১১৩টিরও বেশি দেশি-বিদেশি জাতের গরু, বলদ ও মহিষ। তার এই সফলতা দেখে নরসিংদীর অনেক তরুণ ঝুঁকছেন গরুর খামার গড়ে তোলার দিকে।
ছোটবেলা থেকেই গরুর হাট ও খামারে ঘোরাঘুরি করতেন তৌকিব। সেখান থেকেই গরুর প্রতি জন্ম নেয় আলাদা ভালোবাসা। পড়াশোনা শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে শখকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। নিরলস পরিশ্রম ও একাগ্রতায় ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে তার খামার।
গরুর প্রতি তৌকিবের ভালোবাসা যেন খামারের প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।
খামারে ঢুকলেই দেখা যায়, গরুগুলো তাকে ঘিরে ধরছে, কেউ পথ আটকে দাঁড়াচ্ছে, কেউবা আদর পেতে এগিয়ে আসছে তার হাতের আলতো ছোঁয়ার আশায়। মানুষের সঙ্গে প্রাণীর এমন মায়া ও বন্ধনের দৃশ্য সহজে চোখে পড়ে না। তৌকিবের প্রতি গরুগুলোর এই অদ্ভুত টান যেন খামারটির আলাদা এক পরিচয় হয়ে উঠেছে।
খামারে রয়েছে দেশি গরুর পাশাপাশি শাহিওয়াল, সিন্ধি, নেপালি ও পাকিস্তানি জাতের গরু। প্রতিটি গরুর রয়েছে আলাদা নাম। কোনোটির নাম টাইগার, আবার কোনোটি পরিচিত নরসিংদীর গ্যাংস্টার নামে। যে গুলোর মূল্য ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব গরু দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের এলাকার মানুষজন।
খামারের গরুগুলোকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হচ্ছে। নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত ঘাস, ভুট্টা, খড়, কুঁড়া ও ভুসি দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়ানো হয় গরুগুলোকে। গরু মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের ওষুধ বা ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয় না বলে জানিয়েছেন খামার কর্তৃপক্ষ।
খামারে কর্মরত রয়েছেন ১৫ জন শ্রমিক। তারা প্রতিদিন গরুর পরিচর্যা, গোসল করানো ও খাবার সরবরাহের কাজ করছেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় অসচ্ছল কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
জে এস এগ্রোর পরিচালক তৌকিব হোসেন বলেন, আমি আর আমার বড় ভাই শখ করে প্রথমে ৮টি গরু দিয়ে শুরু করি। পরে ক্রেতাদের ভালোবাসা ও আস্থার কারণে ধীরে ধীরে খামার বড় হয়েছে। এখন আমাদের খামারে ১১৩টি গরু রয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছি। অভিজ্ঞতা না থাকলেও কাজ করতে করতে তারা শিখে যাচ্ছে।
খামার গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই গরুর প্রতি আলাদা আবেগ কাজ করত। বিভিন্ন খামার ও হাটে গিয়ে গরুগুলোকে খেলাধুলা করতে দেখতাম। সেখান থেকেই গরু পালনের স্বপ্ন জন্ম নেয়। শখ থেকেই আজকের এই জে এস এগ্রো ফার্ম।
তিনি আরও জানান, তার মূল ব্যবসা স্মার্ট লুঙ্গি, পাশাপাশি শখের বশেই গরুর খামার পরিচালনা করছেন। আমরা গরু মোটাতাজা করার জন্য কোনো মেডিসিন ব্যবহার করি না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকেও নিয়মিত পরামর্শ ও খোঁজখবর নেওয়া হয় বলেন তিনি।
খামারের কর্মচারী আল আমিন হোসেন বলেন, প্রতিদিন সকালে গরুর ময়লা পরিষ্কার করি, গোসল করাই এবং খাবার দিই। ভুট্টার কুঁড়া, ভুসি ও ঘাস মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। মালিক ভেজাল খাবার দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে কাজ করে পরিবার নিয়ে ভালো আছি।
গরু কিনতে আসা ক্রেতা মো. ফাহিম মিয়া বলেন, ফেসবুকে গরুগুলো দেখে পছন্দ হয়েছে। বিশেষ করে একটি লাল গরু দেখতে এসেছি। পছন্দ হলে কিনব।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিক জানান, তৌকিব অনেক পরিশ্রমী ছেলে। শুরু থেকেই তার খামার দেখছি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে গরু পালন করে। আগের কোরবানিতেও এখান থেকে গরু নিয়েছি, এবারও নেওয়ার ইচ্ছা আছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ছাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা গরু পালনের দিকে ঝুঁকছেন।
এ বছর নরসিংদী জেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ৮৫ হাজার ৯০৫টি গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। জেলার চাহিদা ৭৮ হাজার ৬৪৫টি। অতিরিক্ত পশু পার্শ্ববর্তী জেলার চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও জানান, খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গবাদিপশু লালন-পালন নিশ্চিত করা যায়। অল্প সময়ের পরিশ্রম, ধৈর্য ও নিষ্ঠায় তৌকিব হোসেনের খামার এখন সফলতার প্রতীক। তার এই উদ্যোগ নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে নরসিংদীর অসংখ্য তরুণকে।