
আদালতের দেওয়া ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতি মামলায় আদালতের ডাকে বারবার হাজির না হওয়ায় জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। এত কিছুর পরও চাকরিতে বহাল রয়েছেন নারী পুলিশ সদস্য রোজিনা আক্তার।
বিষয়টি ঘিরে সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রশ্ন, ক্ষোভ ও আলোচনা।
অভিযোগে জানা গেছে, অভিযুক্ত রোজিনা আক্তার (২৯) নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া পূর্বধলা থানার সরাপাড়া গ্রামের মো. আবু তাহেরের মেয়ে। তিনি এক সময় শেরপুর সদর পুলিশ লাইনসে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামালপুর জেলা পুলিশ লাইনসে কর্মরত রয়েছেন।
শেরপুর জেলায় কর্মরত অবস্থায় তিনি জেলা শহরের চকপাঠস্থ নয়ানী সমাজ মহল্লায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করে আসছিলেন।
মামলার বাদীর অভিযোগ এবং নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, চেক জালিয়াতি মামলার আগে জেলার শ্রীবরদী উপজেলার রেখা পারভিন নামে এক নারীর দায়ের করা একটি জালিয়াতির মামলায় শ্রীবরদী সিআর আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে রোজিনা আক্তারকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। এদিকে ওই মামলার সাজা কার্যকর হওয়ার আগেই তিনি নতুন করে আরেকটি প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ দায়ের হওয়া সিআর মোকদ্দমা নং-৫৫০/২০২৫ এর অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে শেরপুর সদর উপজেলার চকপাঠক এলাকার বাসিন্দা মো. রমজান আলীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন রোজিনা আক্তার। পরে পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ রমজান আলীর কাছ থেকে নগদ ১০ লাখ টাকা ধার নেন।ঋণের বিপরীতে তিনি প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড, শেরপুর শাখার একটি চেক প্রদান করেন। কিন্তু পরদিন ৪ মার্চ চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে হিসাব নম্বরে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়ে ফেরত আসে।
পরে ২৫ মার্চ আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিশ পাঠানো হলেও রোজিনা আক্তার টাকা পরিশোধ বা যোগাযোগ করেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। উপায়ান্তর না দেখে বাদী দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারায় শেরপুর আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর আদালত থেকে একাধিকবার তাকে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ পাঠানো হয়; কিন্তু তিনি আদালতের সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে শুনানিতে অনুপস্থিত থাকেন। পরে শেরপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিআর আমলি) আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৭৫ ধারা মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে নোটিশটি পাঠানো হয়; কিন্তু অদ্যাবধি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরঞ্চ শেরপুর পুলিশ লাইনস থেকে পরবর্তীতে ওই পুলিশ সদস্য রোজিনাকে জামালপুর পুলিশ লাইনে বদলি করা হয়।
এদিকে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এবং পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আদালতে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তবে রোজিনা আক্তারের ক্ষেত্রে এখনো এমন কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একজন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেখানে একজন সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত ব্যক্তি কিভাবে নিয়মিত চাকরিতে বহাল থাকেন, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে মামলার বাদী মো. রমজান আলী বলেন, তিনি পুলিশের পোশাক পরে নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন। আমি বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি তিনি আগেই সাজাপ্রাপ্ত। আদালতের পরোয়ানা থাকার পরও কেন তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, সেটা বুঝতে পারছি না। আমি ন্যায়বিচার চাই।
শেরপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোজিনা আক্তারের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্টকৃত নোটিশটি তার নিজ জেলায় পাঠানো হয়েছে সেখান থেকে তার বর্তমান কর্মস্থল জামালপুরে পাঠানো হবে।
এ অভিযোগের বিষয়ে রোজিনা আক্তার বলেন, আমার পাওনাদারের কাজ থেকে টাকা পরিশোধ করার জন্য সময় নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে তিন বছরের সাজার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
জামালপুর জেলা পুলিশ সুপার ফারহানা ইয়াসমিন বলেন,তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তার বাড়ি নেত্রকোনায় সেখানে ওয়ারেন্ট পাঠানো হয়েছে। নেত্রকোনায় যোগাযোগ করেন।