নিজস্ব প্রতিনিধি ও ঢাবি প্রতিনিধি:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫ দফা
রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গণজমায়েত করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ সময় জমায়েত থেকে ৫ দফা দাবি জানিয়েছেন তারা। চলতি সপ্তাহের মধ্যে দাবি না মানা হলে আবারও রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
কর্মসূচিতে ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। দাবিগুলো হলো বিদ্যমান সংবিধান অনতিবিলম্বে বাতিল করে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন সংবিধান লেখা, ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে এই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে এই সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ, এই সপ্তাহের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের আলোকে ‘প্রোকলেমেশন অব রিপাবলিক’ ঘোষণা করা ও বাংলাদেশের বিদ্যমান গণতন্ত্রকামী ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের মতের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে চালানো, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করা ও তিন নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ও তারা যেন নির্বাচনে কখনো নির্বাচন করতে না পারে, সে জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
এদিকে সমাবেশে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সারা দেশে ও ক্যাম্পাস ক্রিয়াশীল গণতান্ত্রিক ধারার রাজনৈতিক দলগুলো আছে- বিএনপি, জামায়াত, ডানপন্থি, বামপন্থি, উভয়পন্থি যে মতাদর্শেরই হোক না কেন, যারা বাংলাদেশের প্রশ্নে আপসহীন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য যারা রাজনীতি করেন, যতদিন না তাদের সুস্থ ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারছি, ততদিন পর্যন্ত আমাদের বিপ্লব শেষ হয়ে হবে না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এ সমন্বয়ক আরও বলেন, মুজিববাদী আওয়ামী শক্তিকে বাংলাদেশ থেকে স্থায়ীভাবে উৎখাত করার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের দলীয় স্বার্থে আমরা পৃথক হয়ে গেলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তি আমাদের ওপর আবার জেঁকে বসবে। সে জন্য গণতন্ত্রকামী ও বাংলাদেশের প্রশ্নে আপসহীন রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা আহ্বান জানাব, মুজিববাদীদের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের একটাই অবস্থান- আমরা মজলুম, তারা জালিম। জালিমের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান চলবে।
আরেক সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। যে ছাত্রলীগের হাতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেন, এই শহিদ মিনার থেকে আমাদের বিপ্লব শুরু করেছিলাম।
গণজমায়েতে সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আবারও যদি প্রয়োজন হয়, আমরা আমাদের চোখ দিতে প্রস্তুত, পা দিতে প্রস্তুত, হাত দিতে প্রস্তুত, এমনকি জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। ফ্যাসিস্ট দল ছাত্রলীগ যেভাবে আমাদের ভাইদের হত্যা করেছে, তাদের উত্থান সহ্য করা হবে না। রাষ্ট্রপতির এই ‘নয়-ছয়’ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। হাসিনার মতো তাকেও দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম, লুৎফর রহমান, রিফাত রশীদ প্রমুখ।
এর আগে মঙ্গলবার বেলা ৩টায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন ব্যানার নিয়ে দলে দলে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জড়ো হতে শুরু করে। ‘বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসক ও স্টুডেন্ট পরিষদ’, ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি, ঢাকা মহানগর’, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, মিরপুর’ ইত্যাদি ব্যানার নিয়ে আন্দোলনকারীরা উপস্থিত হন। বিকাল ৫টায় শহিদ মিনার থেকে মিছিল বের করে। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে শেষ হয়।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণজমায়েত কর্মসূচিতে নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আমরা জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি- প্রথমত আমরা খুনি হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমের কোনো অংশ এই দেশে দেখতে চাই না।বাংলাদেশে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে যারা ছাত্র-জনতার ওপর গুণ্ডাগিরি চালিয়েছে, সাহাবুদ্দিনের সেই ক্ষমতার অংশ।
আমরা অবিলম্বে খুনি হাসিনার এই দোসরের পদত্যাগ দাবি করছি। দ্বিতীয়ত আমরা বাংলাদেশে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবি জানাচ্ছি। গত ১৫ বছরে আমাদের যেসব ভাইয়ের গুম-খুন করা হয়েছে, তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রের যেসব বাহিনী গুম-খুনের নেতৃত্ব দিয়েছে, আমরা তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আহ্বান ও দাবি জানাচ্ছি। আমরা ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি জানাচ্ছি।
নাসীরুদ্দীন বলেন, অবিলম্বে এসব দাবি মানা না হলে আমরা ছাত্র-নাগরিকদের অভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত বিপ্লবের দিকে নিয়ে যাব। সেদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবিলম্বে সব সমস্যার মূল কারিগর ফ্যাসিস্ট বাকশালী সংবিধান বাতিল করে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে একটি প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। এসব দাবি এই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন না হলে আমরা জাতীয় নাগরিক কমিটি দেশের সব দল, নাগরিক অংশীজনদের নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব।
মধুর ক্যান্টিনে রাষ্ট্রপতির কুশপুত্তলিকা দাহ: রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি জানিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে নেতাকর্মীরা এ কুশপুত্তলিকা দাহ করেন তারা। এ সময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগানও দেন তারা।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, শেখ হাসিনার পলাতকের পর রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দিতে বলেছিলাম আমরা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম, গণঅভ্যুত্থানের ম্প্রিরিট ধরে রাখতে একটি বিপ্লবী সরকার গঠন করা যেতে পারে। কিন্তু তারা রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে যে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটির খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি অপসারণসহ ৪ দফা দাবি: রাষ্ট্রপতির অপসারণসহ ৪ দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা কমিটি (স্মারক) নামের এক প্ল্যাটফর্ম। মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑফ্যাসিবাদের দোসর অবৈধ রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা; সংবিধান বাতিল করা; বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন করা এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪ দলকে নিষিদ্ধ করা।
কর্মসূচিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও স্মারকের অন্যতম সংগঠক মনিরুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগ ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন চালিয়েছে। সেই আওয়ামী লীগের নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি তার পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন বহু আগেই। তিনি বলেন, এই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে হবে। দেশে বিপ্লবী সরকার গঠন করতে হবে এবং অবশ্যই সন্ত্রাসী বাহিনী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। অবস্থান কর্মসূচি শেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হন। এরপর থেকে তারা বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান করছেন।
বঙ্গভবনের নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা: রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে ছাত্র-জনতা। তারা শেখ হাসিনার মতো একই পরিণতি চায় রাষ্ট্রপতির। আন্দোলনকারীরা বলেছেন, সাবেক পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকৃত সহযোদ্ধা ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কথামতো তিনি কাজ করেছেন। জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে ছাত্র-জনতার পক্ষে একটি বাক্যও বলেননি। তিনি চুপচাপ নীরব ফ্যাসিস্টের ভূমিকায় ছিলেন। এখন আবারও শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার পাঁয়তারা করছেন। পদত্যাগপত্র নিয়ে নানা হাস্যকর কাহিনি ছড়াচ্ছেন। এ কারণেই রাষ্ট্রপতির অপসারণ জরুরি।
মঙ্গলবার বিকালে থেকেই বঙ্গভবনের সামনে খণ্ড খণ্ড মিছিল-স্লোগান নিয়ে ছাত্র-জনতা জড়ো হতে থাকে। সন্ধ্যার পর জমায়েত বাড়ে। রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন তৈরির সময়ও বিক্ষোভ চলছিল। এ সময় বঙ্গভবনের সামনের নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন একদল বিক্ষোভকারী। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বাধা দিতে দেখা যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে আন্দোলনরত কিছু ছাত্র-জনতা হঠাৎ নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে।এ সময় আন্দোলনকারীদের বাধা দেয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এক পর্যায়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের দেন। পরে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
রামপুরার ইমপেরিয়াল কলেজের চার শিক্ষার্থী একসঙ্গে যোগ দেন এই বিক্ষোভে। রাষ্ট্রপতির সমালোচনা করে তারা বলেন, পদত্যাগের ইস্যুটি উনি হঠাৎ কেন সামনে আনলেন? এখানে নিশ্চয়ই ভিন্ন মতলব আছে। দেশকে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত করছেন তিনি। আমরা তাকে এই পদে আর চাই না। আমরা তার অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।
ডিএমপির মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হুসাইন মুহাম্মদ ফারাবী বলেন, বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে বিপুল পরিমাণ পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।