জানা যায়, ঘোড়াশাল রেলওয়ে ফ্লাগ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ডিপো স্থাপনের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রাথমিক সীমানা নির্ধারণ ও মাইকিং করে বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য নোটিশ দেয়া হয়েছে এবং সকল স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।প্রস্তাবিত ডিপোর আওতায় ঘোড়াশাল সাদ্দাম বাজার থেকে মুসাবিন হাকিম ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা অন্তরর্ভুক্ত রয়েছে। এখানে রয়েছে একটি ডিগ্রি কলেজ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, পৌরসভার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, খেলার মাঠ, মসজিদ, মাদ্রাসা, নিবন্ধিত খেলাধুলা করার ক্লাব, সরকারি ডাকঘরসহ ঐতিহ্যবাহী পালপাড়া।
স্থানীয়রা বলেন, এখানে কন্টেইনার ডিপো স্থাপন আমাদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। উন্নয়নের নাম দিয়ে যদি আমাদের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্রগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয় তা হলে সেই উন্নয়ন আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় কন্টেইনার ডিপো স্থাপন মানে শুধু একটি প্রকল্প নয়। এটা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ওপর এক ভয়াবহ চাপ। অবিরাম শব্দদূষণ, অমানবিক যানজট, প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কায় একটি পুরো জনপদকে ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ করে তোলা হবে।
এটা কোনোভাবেই উন্নয়ন নয়। এটা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দেয়া। আমাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়া। আমাদের সন্তানের নিরাপদ শৈশব, শিক্ষার নিশ্চয়তা, প্রবীণদের শান্ত ও নিরাপদ জীবন, আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক বন্ধন সবকিছুই আমাদের কাছে অমূল্য।
ঘোড়াশাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা হেলাল উদ্দিন বলেন, ঘোড়াশাল শুধু একটি এলাকা নয়। এটি মানুষের বসতি, স্বপ্ন, শিক্ষা আর সংস্কৃতির এক জীবন্ত কেন্দ্র। এখানে কন্টেইনার ডিপোর মতো ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প চাপিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে একটি জনপদকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা।
উন্নয়নের নামে যদি মানুষের ঘরবাড়ি উচেছদ হয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়, মসজিদ-মাদ্রাসা-ঈদগাহ-খেলার মাঠ হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে উন্নয়ন নয়, সেটি হচ্ছে অবিচার। সরকারের নিজস্ব নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, এ ধরনের ডিপো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে স্থাপন করতে হবে।
আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দিতে চাই। ঘোড়াশালের মানুষ নীরব থাকতে জানে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও জানে। এই প্রকল্প যদি জনমত উপেক্ষা করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমরা গণমানুষকে সঙ্গে নিয়ে আইনগত ও গণতান্ত্রিক সব ধরনের আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পাইকসা দাখিল মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষক কায়ছারুল আলম খান মিঠু বলেন, উন্নয়ন প্রয়োজন, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে এ ধরনের প্রকল্প হলে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে। ভারী যানবাহনের শব্দে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
এ ধরনের প্রকল্প স্থাপন করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ভারী যানবাহনের অবিরাম চলাচল, হর্নের উচ্চ শব্দ এবং যান্ত্রিক কার্যক্রমের কারণে তীব্র শব্দদূষণ সৃষ্টি হবে, যা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও পাঠ গ্রহণের স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করবে। সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শিক্ষার মান অক্ষুণ্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ ও গণমাধ্যমকর্মী মাহবুব সৈয়দ মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, সার্বক্ষণিক যানবাহনের আসা-যাওয়া, হর্নের শব্দ এবং যান্ত্রিক কার্যক্রমের কারণে শব্দদূষণ উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, যা বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলবে। পাশাপাশি যানবাহনের ধোঁয়া ও অন্যান্য নির্গমনের ফলে বায়ুদূষণও বাড়বে, যা শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়াও এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়বে, ভারী যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে। এতে করে এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে। সব মিলিয়ে, এ ধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বসবাসের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়ে গিয়ে এলাকা ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।