বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

ভোটের ঘণ্টা বাজল বুঝি

খলিলুর রহমান রানা।।  বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫৩ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫৩ বছর পূর্তি ও ৫৪ বছরে পদার্পণের ২০২৪-এর বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘মোটাদাগে বলা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায়।

নির্বাচন নিয়ে তার এ ঘোষণা সারা জাতিকে উজ্জীবিত করেছে। আবার রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময় নিয়ে কৌতূহল ছিল, ধোঁয়াশা ছিল সেটাও কেটে গেছে এ ভাষণের পর।

তাই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের মধ্যে বলাবলি শুরু হয়েছে, তবে বেজে উঠল কি নির্বাচনের ঘণ্টা? গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।

আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয় গত ৮ আগস্ট। যে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কয়েক দফায় উপদেষ্টা সংখ্যা বাড়ানো হয়। তবে সরকারের মেয়াদ তিন মাস না যেতেই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কথা চালাচালি হচ্ছিল কবে নাগাদ নির্বাচন হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি একটি নির্বাচনি রোডম্যাপ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কথা বলে যাচ্ছিল।

আর সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন উপদেষ্টা বলেন, আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন। বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য প্রথমে ৬টি, পরে ৪টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। ইতিমধ্যে প্রথমে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত শে^তপত্র সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এরপর গুম-হত্যা সংক্রান্ত কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। এখনও কয়েকটি কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়া বাকি রয়েছে। 

গতকাল প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে ঘোষণা দেন আগামী মাসে একটি কমিশন গঠন করা হবে। যে কমিশনের কাজ হবে নির্বাচন নিয়ে কীভাবে একমত হতে পারে সব রাজনৈতিক দল সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা।

এর আগেও প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ভাষণে নির্বাচন নিয়ে বা নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। আর এসব ভাষণে কোনো ধরনের নির্বাচনের বিষয় না আসায় প্রত্যেকবার বিএনপির মহাসচিব থেকে শুরু করে অন্যান্য নেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। 

সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের পর কোনো কোনো উপদেষ্টা বলেছিলেন, নির্বাচনের ট্রেন ছাড়ল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নির্বাচনের তারিখ সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হবে। তারা শুধুু নির্বাচনের জন্য যে সব বিষয় আয়োজন করে রাখা প্রয়োজন সেগুলো করবেন। 

উপদেষ্টারা বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কবে নাগাদ হতে পারে তা নিয়ে তাদের ব্যক্তিগত মন্তব্য করে গেছেন। এমনকি কোনো কোনো উপদেষ্টা নির্বাচনের সময় নিয়ে তাদের ব্যক্তিগত মন্তব্য করতে গিয়েও উপদেষ্টা পরিষদের সভায় তোপের মুখে পড়েছেন।

দেশের বাইরে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন (অব.) বলেছিলেন, আগামী ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ নির্বাচন হতে পারে। আবার গত ৭ ডিসেম্বর ঢাকার গুলশানে এক সেমিনারে শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, আগামী বছরই রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেখা যাবে।

তবে তিনি পরে বলেছিলেন, এটি একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। তিনি শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন, আসলে কী হবে তিনি নিজেও জানেন না। 

এর আগে অর্থাৎ গত ২৩ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যেন আগামী ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে সে জন্য তিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দেবেন।

পরে সেনাপ্রধানের বক্তব্যের রেশ ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছিলেন, নির্বাচন ১৬ মাস নাকি ১২ মাস পর হবে তা এখনই নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। তিনি সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মত বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও যোগ করেন, প্রধান উপদেষ্টা সবসময় বলে আসছেন নির্বাচন কখন হবে তা জনগণ ঠিক করবে।

পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে নির্বাচন প্রশ্নে বারবার বলা হয়েছে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন প্রধান উপদেষ্টা। শুধু তাই নয়, গত ২৪ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের প্রেস বিফ্রিংয়ে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা সুবিধামতো সময়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন। একইভাবে বলা হয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে এখনও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের আয়োজনের প্রতিশ্রুতির কথা শুরু থেকেই বলে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার। 

এর আগে নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের ঘোষণার দিন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, নির্বাচনি ট্রেন যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে আগে সংস্কার না নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা অব্যাহত থাকে। তবে কোনো ঘোষণাতেই ধোঁয়াশা কাটছিল না। 

বিভিন্ন উপদেষ্টার কাছে নির্বাচনের সময় সাংবাদিকরা জানতে চাইলে অনেকে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করতেন। কেউ নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট সময় বলতে না পারলেও, এতটুকু স্বীকার করেছেন যে, একটা নির্বাচনের দিকে যেতেই হবে দেশকে। এটাই হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের বড় প্রাধান্য। আবার নির্বাচনের সঙ্গে সংস্কারের বিষয়টি জুড়ে দিয়েছেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত রোববার অর্থাৎ প্রধান উপদেষ্টার বিজয় দিবসের ভাষণ দেওয়ার এক দিন আগে ভার্চুয়ালি এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার কথা তুললে উপদেষ্টাদের চেহারায় অস্বস্তির ছাপ ফুটে ওঠে, যা জন-আকাক্সক্ষার বিরোধী। 

অবশেষে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে নির্বাচনের ঘণ্টা বেজে উঠল। আর নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ধোঁয়াশা ভাব ছিল তা এখন কেটে যাবে বলেও প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


https://www.facebook.com/profile.php?id=100089135320224&mibextid=ZbWKwL