নরসিংদীতে এক ভিন্নরকম নারীর সন্ধান পাওয়া গেছে। পেশায় তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হলেও ধর্ষণের মামলা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার নেশা।
তিনি নরসিংদীর জেলার সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা যৌন হয়রানি অভিযোগ করে নানাভাবে হেনস্তা করে আসছেন। দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর ধরে এই রমরমা ব্যবসা চালিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরা ছোঁয়ার বাহিরে । কেউ কিছু বললেই ধর্ষণের মামলা ও অভিযোগ দিয়ে দেন। ফলে মানসম্মানের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চান না। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ছবি এবং ভিডিও এডিট করে এই নারী তার প্রোফাইলে পোস্ট করে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এই শিক্ষিকার হীন কাজের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে পুরো জেলাবাসী।
নরসিংদী পুলিশ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই নারী এখন পর্যন্ত সমাজের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের একাধিক মামলা দায়ের করেছেন। পাশাপাশি তার ফেসবুক টাইমলাইনে সম্মানিত ব্যক্তিদের ছবি পোস্ট করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য অব্যাহত রেখেছেন। টাকা পেলে ফেসবুকের লাইভে এসে সেই সব ব্যক্তিদের কাছে ক্ষমা চাওয়ারও ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা যায়। এ পরিস্থিতিতে নরসিংদীর শিক্ষা বিভাগও তাকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছে।
সহকারি শিক্ষিকা শারমিন রেজোয়ানাকে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
মাধবদীর আলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই শিক্ষিকার নাম শারমীন রেজোয়না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯ এর ২ এর (ক), (ঘ), (চ) ও (ছ) ধারা লঙ্ঘণপূর্বক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল কথাবার্তাসহ নেতিবাচক পোস্ট করায় তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। বিভাগীয় মামলাটির চলমান ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৩৯ (১) ধারা মোতাবেক সহকারি শিক্ষিকা শারমিন রেজোয়ানাকে গত ০৯ এপ্রিল জেলা শিক্ষা অফিস এই আদেশ কার্যকর করে তাকে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে বরখাস্তকালীন তিনি বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের আমলে এক নেতার সুপারিশে তিনি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পান। এরপর মহৎ পেশার আড়ালে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। নিজেকে এতিম ও অসহায় দাবি করে সহায়তা চান এবং ভিডিও কল দিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে কৌশলে গোপনে স্ক্রিনশট নেন। একসময় দেখা করার অনুমতি চান। নানা সমস্যার কথা বলে সহায়তা চান। ঘনিষ্ঠতা বাড়লে আপত্তিকর প্রস্তাব দেন। রাজি না হলে নানা হুমকি দেন। যদি তাও কাজ না করে, যৌন হেনস্তার অভিযোগ তুলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। না দিলে প্রথমে তার ফেসবুক টাইমলাইনে এসব ব্যক্তির ছবি পোস্ট করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাতেও কাজ না হলে ধর্ষণের মামলা দায়ের করে দেন। এভাবে ব্ল্যাকমেইল করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তার ফাঁদে পা ফেলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সম্মানিত মানুষ হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন, তার বাড়ির মালিক থেকে শুরু করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ঠিকাদার, সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদসহ অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে তাদের হেয়প্রতিপন্ন করেছেন। তার ফেসবুকে এসব ব্যক্তির ছবি পোস্ট করে ধর্ষকসহ নানা আপত্তিকর লেখা লিখে রেখেছেন।
টাকা না দিলেই তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় পুলিশি অ্যাকশন। এই নারী বেশ কয়েকজনকে জেলও খাটিয়েছেন এবং পরে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে আপস করেছেন। তবে আপস হওয়ার পরও আবার টাকা দাবি করছেন। টাকা না দিলে তার ফেসবুকে আবারও আপত্তিকর লেখা পোস্ট করছেন। এমনকি পিতা-পুত্রের ছবি পোস্ট করেও আপত্তিকর লেখা লিখেছেন। যার ফলে অনেক সংসারে অশান্তির ঝড় বইছে এবং কয়েক জনের সংসার ভেঙে গেছে।
ধর্ষণকে ব্যবসা হিসেবে নেওয়া এই নারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য কুরুচিসম্পন্ন বক্তব্য রয়েছে। তিনি নিজেই স্বীকার করছেন তিনি ধর্ষণের শিকার। তবে বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করার কয়েকদিন পর তিনি আবার মামলা তুলে নেন। শিক্ষিকা শারমিন রেজোয়ানা চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত হলেও এখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিজ নামীয় ফেসবুকে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে জেলাজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে।
নরসিংদী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (চঃ দাঃ) নিরঞ্জন কুমার রায় ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমরা বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিয়েছি। ভবিষ্যতে এধরণের কর্মকান্ডে লিপ্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে আরোও কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে নরসিংদী সদর থানার ওসি এমদাদুল হক বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।