সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০২:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর আত্মহত্যা মারা গেছেন মেসির বাবা! জ্বালানি তেল আমদানি নীতিমালা নিয়ে বিভ্রান্তি, যা বলছে মন্ত্রণালয় রেলওয়ের অবহেলায় ভোগান্তি ও ঝুঁকিতে যাত্রীরা: নরসিংদী ও জিনারদীতে চরম দুর্ভোগ ভারতকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবেন আর বন্ধুত্ব চাইবেন, দুটো বিপরীতমুখী বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু নরসিংদীর আলোকবালীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ১ দশম গ্রেডের চাকরি, শতকোটি টাকার সম্পদ! রহনপুর পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সায়েমকে ঘিরে তোলপাড় নরসিংদীতে জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা নরসিংদীর শিবপুরে ৯০০ গ্রাম গাঁ’জা ও ১ লাখ ৫ হাজার টাকা সহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রে’প্তার।

সফল সন্তান ও মানুষ তৈরি করা: সমাজ ও পরিবারের অসঙ্গতি

         ।। কাজী আনোয়ার কামাল।।

সন্তান জন্ম দেওয়া সহজ, কিন্তু একজন প্রকৃত মানুষ তৈরি করা কঠিন। আজকের সমাজে প্রায় সব বাবা-মা-ই চান তাদের সন্তান সফল হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক, ভালো আয় করুক, সম্মান অর্জন করুক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই মানুষ তৈরির চেয়ে সফলতা তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়িনি?
বর্তমান সমাজ ও পরিবারে এমন অনেক অসঙ্গতি রয়েছে, যা সন্তানদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে আমরা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষ পাচ্ছি, কিন্তু মানবিক মানুষ পাচ্ছি না; দক্ষ কর্মী পাচ্ছি, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক পাচ্ছি না।
সফলতার সংজ্ঞার সংকীর্ণতা আমাদের সমাজে সফলতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ, চাকরি, পদ-পদবি ও সামাজিক মর্যাদা। একজন সন্তান যদি ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বড় কর্মকর্তা হয়, তবে তাকে সফল ধরা হয়। কিন্তু সে কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক বা দেশপ্রেমিক—এসব বিষয় প্রায়ই গুরুত্ব পায় না।
ফলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শিখে যায়, মানুষ হওয়ার চেয়ে বড়লোক হওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের ভেতরের দ্বিচারিতা অনেক পরিবার সন্তানকে সততা, নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের শিক্ষা দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে সন্তান দেখে তার বাবা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করছেন, মিথ্যা বলছেন, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করছেন বা অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন।
শিশুরা কথার চেয়ে কাজ থেকে বেশি শিক্ষা নেয়। তাই পরিবারে নীতিকথা আর বাস্তব আচরণের মধ্যে যখন ফারাক তৈরি হয়, তখন সন্তানের মধ্যেও বিভ্রান্তি জন্ম নেয়।
নম্বর ও জিপিএ-নির্ভর মূল্যায়ন বর্তমান শিক্ষা ও পারিবারিক সংস্কৃতিতে সন্তানদের মূল্যায়ন অনেকাংশে পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। একটি শিশুর সৃজনশীলতা, মানবিকতা, নেতৃত্বগুণ, সহমর্মিতা বা সামাজিক দায়িত্ববোধকে খুব কমই মূল্য দেওয়া হয়।
ফলে সন্তানরা শিখে যায়, ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে ভালো ফল করাটাই বেশি জরুরি।
প্রযুক্তির অপব্যবহার ও পারিবারিক দূরত্ব
একসময় পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করতেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করতেন। এখন অনেক পরিবারে একই ঘরে বসেও সবাই নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত।
এই দূরত্বের কারণে সন্তানরা পারিবারিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও জীবনের বাস্তব শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রযুক্তি প্রয়োজনীয় হলেও তার অতিরিক্ত ব্যবহার পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সামাজিক প্রতিযোগিতা ও তুলনার সংস্কৃতি
আমাদের সমাজে সন্তানদের প্রায়ই অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। “অমুকের ছেলে প্রথম হয়েছে”, “তমুকের মেয়ে বিদেশে পড়ছে”—এ ধরনের তুলনা শিশুর আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব প্রতিভা ও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তুলনার সংস্কৃতি তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
নৈতিক শিক্ষার অবহেলা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক জীবনে সবাই যেন এগিয়ে যাওয়ার চিন্তায় ব্যস্ত, কিন্তু কিভাবে একজন ভালো মানুষ হওয়া যায়, সে শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
ফলে সমাজে শিক্ষিত দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতাবান অসৎ ব্যক্তি ও দায়িত্বহীন নাগরিকের সংখ্যা বাড়ছে। সময়ের অভাব নয়, অগ্রাধিকারের অভাব অনেক বাবা-মা দাবি করেন, সন্তানকে সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি সময়ের অভাব নয়, বরং অগ্রাধিকারের অভাব। সন্তানকে দামি পোশাক, স্মার্টফোন বা কোচিং দেওয়া সহজ; কিন্তু তার সঙ্গে বসে কথা বলা, তার মন বোঝা এবং জীবনের মূল্যবোধ শেখানো তুলনামূলক কঠিন।
অথচ একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাবা-মায়ের উপস্থিতি ও সঠিক দিকনির্দেশনা।
করণীয় সফল সন্তান গড়তে হলে প্রথমে সফল মানুষ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। পরিবারকে হতে হবে সততা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার প্রথম বিদ্যালয়। সন্তানকে শুধু প্রতিযোগিতার জন্য নয়, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলির জন্যও প্রস্তুত করতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ একটি শিশুর চরিত্র গঠনের দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, পুরো সমাজের।
উপসংহার একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার সন্তানের ওপর। আমরা যদি শুধু অর্থ উপার্জনকারী মানুষ তৈরি করি, কিন্তু নৈতিক ও মানবিক মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে সমাজে উন্নয়ন আসবে, কিন্তু শান্তি আসবে না; অট্টালিকা উঠবে, কিন্তু মূল্যবোধের ভিত্তি দুর্বল হবে।
তাই আজ সময়ের দাবি—সন্তানকে শুধু সফল নয়, সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ একজন ভালো মানুষই প্রকৃত সফল মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


https://www.facebook.com/profile.php?id=100089135320224&mibextid=ZbWKwL