শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
সাংবাদিক গ্রেফতার আর কত? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কি কেবল কাগজে-কলমে? কাপ্তাই প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহফুজ, সম্পাদক রিপন মারমা নির্বাচিত রায়পুরায় পুলিশের জালে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাখাওয়াত গ্রেপ্তার নরসিংদীর রায়পুরায় দিনদুপুরে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: স্বর্ণালংকার লুট, এলাকায় চরম আতঙ্ক অসহায় মিলন রানী দাসের পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও ফারজানা ইয়াসমিন নরসিংদীর মাধবদীতে চাঞ্চল্যকর খুনসহ ডাকাতির ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেপ্তার জামায়াতের এমপি গোলাম রসুলের বাড়ি ঘেরাও আওমীলীগ সরকারের আমলে দিনের ভোট রাতে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩২ জন ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে। নরসিংদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা ও সিলগালা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান মাধবদীতে অবৈধ জাল পুড়িয়ে ধ্বংস

সাংবাদিক গ্রেফতার আর কত? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কি কেবল কাগজে-কলমে?

লেখক: এম এ মমিন আনসারী

সম্পাদকীয় 

লেখক: এম এ মমিন আনসারী
মহাসচিব
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ (বিএসকেপি)

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হলো স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং মুক্ত গণমাধ্যম। এই তিনটির মধ্যে কোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে গণতন্ত্রের ভিত্তিও নড়বড়ে হয়ে যায়। আর গণমাধ্যমের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছেন সাংবাদিক। তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহকারী নন; তিনি জনগণের চোখ, কান এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিবেকেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই একজন সাংবাদিকের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা কেবল একটি পেশাগত দাবি নয়, এটি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষারও পূর্বশর্ত।

সাংবাদিকের দায়িত্ব সত্য অনুসন্ধান করা, তথ্য যাচাই করে জনসম্মুখে তুলে ধরা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। ইতিহাসে দেখা গেছে, বহু বড় দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রথম প্রকাশ করেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাহসী প্রতিবেদন। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে শুধু সাংবাদিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং সর্বোপরি জনগণ।দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার, হুমকি, হয়রানি ও নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা সংশ্লিষ্ট সংবাদ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। এতে একটি অস্বস্তিকর বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখলে সাংবাদিক নিজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সাংবাদিক কি অপরাধী, নাকি জনগণের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার একজন প্রতিনিধি?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক, বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এই অধিকার শুধু সাংবাদিকের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে অবহিত রাখাই গণমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব। ফলে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের অযৌক্তিক হয়রানি সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

অবশ্যই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। সাংবাদিক যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেন, মানহানি ঘটান বা পেশাগত নীতিমালা লঙ্ঘন করেন, তবে তারও আইনগত জবাবদিহিতা থাকা উচিত। কিন্তু আইনের শাসনের মূলনীতি হলো—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বিচার শুরুর আগেই গ্রেফতার বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।

বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। যে রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন, সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে সংবাদকর্মীরা যদি প্রতিনিয়ত মামলা, গ্রেফতার ও চাপের মুখে থাকেন, তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের কারণে ক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি মনে করেন প্রতিবেদনটি ভুল বা একপেশে হয়েছে, তবে তার জন্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। প্রতিবাদলিপি প্রকাশ, তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, ব্যাখ্যা প্রদান কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি—এসবই একটি সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। তাই সাংবাদিককে শত্রু মনে না করে তথ্যের মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।সাংবাদিকতার নৈতিকতা রক্ষার দায়িত্ব যেমন সাংবাদিকদের, তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ একটি স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারবিরোধী নয়; বরং এটি রাষ্ট্রকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী হতে সহায়তা করে। সমালোচনা গণতন্ত্রের শত্রু নয়, বরং গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখার অন্যতম উপাদান।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবাদপত্র সমাজের আয়না। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে অসন্তুষ্ট হয়ে আয়না ভেঙে ফেললে বাস্তবতা বদলে যায় না। একইভাবে সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে বা গ্রেফতার করে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা অন্যায়কে চিরদিন আড়াল করে রাখা সম্ভব নয়। সত্যকে সাময়িকভাবে বিলম্বিত করা যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।

আজ সময় এসেছে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার। সাংবাদিকের স্বাধীনতা যেমন সীমাহীন নয়, তেমনি রাষ্ট্রের ক্ষমতাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই ভারসাম্যই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য।পরিশেষে বলতে চাই, সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়; বরং জনগণের জানার অধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করা। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বার্থেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কারণ মুক্ত গণমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের দুর্বলতা নয়—এটি একটি শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম পরিচয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


https://www.facebook.com/profile.php?id=100089135320224&mibextid=ZbWKwL