খলিলুর রহমান রানা,নরসিংদী থেকেঃ
ব্যক্তিগত জীবনে যিনি ছিলেন অসম্ভব মিশুক, সদা হাস্যোজ্জ্বল, অত্যন্ত সহজ-সরল এবং বিনয়ী আজ সেই মানুষটিই জীবনের সঙ্গে লড়ছেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গতায়।
মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যিনি কলম ধরেছেন, সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরেছেন রাজপথে, আজ সেই সাংবাদিক এম এ সালাম রানার নিজের জীবনেই নেমে এসেছে অন্ধকারের দীর্ঘ অমাবস্যা। ২০১৪ সাল থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে ঘরবন্দী এই মানুষটি আজ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
নরসিংদীর সাংবাদিক সমাজে এম এ সালাম রানা এক পরিচিত ও ভালোবাসার নাম। আজকের কাগজ, বণিক বার্তাসহ জাতীয় ও স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যমে সুনামের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি তিনি যুক্ত ছিলেন নরসিংদী প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে। সহকর্মীদের বিপদে-আপদে যিনি সবার আগে ছুটে যেতেন, যিনি হাসিমুখে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতেন আজ সেই মানুষটিই নিজের অসুস্থতার কথা কাউকে বলতে পারেন না। কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলা এই প্রবীণ সাংবাদিক এখন সমাজের চোখের আড়ালে নীরবে সহ্য করছেন প্রতিদিনের যন্ত্রণার নিঃশব্দ কান্না।
দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় জমানো সব সম্বল ফুরিয়ে গেছে বহু আগেই। নিয়মিত ওষুধ কেনা, চিকিৎসকের ফি আর দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ মেলাতে পরিবারটিতে চলছে অমানবিক টানাপোড়েন। স্বামী বিছানায় শয্যাশায়ী থাকায় সংসারের হাল ধরেছেন তাঁর স্ত্রী; তাঁর সীমিত উপার্জনেই কোনোমতে চলছে চার সদস্যের সংসার।
এই চরম দুর্দিনে একটু সুদিনের আশায় গত ১০ বছরে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে চারবার অনুদানের জন্য আবেদন করেছেন সালাম রানা। কিন্তু মর্মান্তিক সত্য হলো, তাঁর একটি আবেদনও নাকি ট্রাস্টের কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছায়নি! নরসিংদী জেলায় এমন অনেকেই অনুদান পেয়েছেন যাঁরা আর্থিকভাবে সচ্ছল ও সুস্থ, অথচ যিনি বিছানায় ধুঁকছেন, যাঁর ওষুধের টাকা জোগাড় করতে পরিবারকে সর্বস্বান্ত হতে হয় তিনি বছরের পর বছর বঞ্চিত।
প্রশ্ন আজ বিবেকের কাছে?
যাঁরা সারাজীবন সমাজের নানা অনিয়ম ও মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা লিখে গেছেন, আজ তাঁদের নিজের জীবনেই নেমে এসেছে চরম অবহেলা। প্রশ্ন জাগে—একজন অসহায়, গুরুতর অসুস্থ সাংবাদিকের আবেদন যদি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দরজাতেই না পৌঁছায়, তবে কোথায় আটকে গেল সেই আর্তনাদ? কার উদাসীনতার বলি হচ্ছেন সালাম রানা?
সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট গঠিতই হয়েছিল বিপদের দিনে প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সালাম রানা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ চান না, তিনি কেবল চান একজন অসুস্থ সাংবাদিক হিসেবে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও ন্যূনতম অধিকারটুকু।
বিনয়ী ও পরোপকারী এই মানুষটির দীর্ঘ ১২ বছরের যন্ত্রণা আর বঞ্চনার ইতিহাস আজ গোটা সাংবাদিক সমাজ তথা বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে। সময় এসেছে এই অনিয়মের হিসাব খোঁজার এবং অবিলম্বে সালাম রানার পাশে দাঁড়ানোর।